সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
Sokaler Bangladesh

লোহাগাড়ায় ইউএনওর বাংলোয় সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ, নিরাপত্তায় থানায় আশ্রয়



লোহাগাড়ায় ইউএনওর বাংলোয় সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ, নিরাপত্তায় থানায় আশ্রয়

প্রকাশিত সংবাদের জের ধরে এক সংবাদকর্মীকে সরকারি বাসভবনে (বাংলো) ডেকে এনে নির্মমভাবে প্রহারের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে। নির্যাতন শেষে প্রতিকার চেয়ে থানায় যাওয়ার পথে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ওপর দ্বিতীয় দফায় চড়াও হয় স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় লোহাগাড়াসহ সমগ্র চট্টগ্রামে সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

আক্রান্ত সাংবাদিক মিজান একটি জাতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকার লোহাগাড়া উপজেলা প্রতিনিধি। তিনি অভিযোগ করেন, লোহাগাড়ার ইউএনওর অনিয়ম-দুর্নীতি এবং স্থানীয় কিছু নামধারী বিএনপি নেতার ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেই তাঁকে এভাবে চক্রান্ত করে নির্যাতন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল ফোন করে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ইউএনওর বাংলোতে যেতে বলেন। অফিসের ফোন পেয়ে মাগরিবের নামাজের পর সরল বিশ্বাসেই তিনি সেখানে যান। কিন্তু বাংলোর ভেতরে প্রবেশ করার পরই তাঁর ওপর নেমে আসে নির্যাতন।

কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তাঁর হাতের মুঠোফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ইউএনও মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলোতে আগে থেকেই অবস্থান করছিল স্থানীয় বিএনপি নেতা মোরশেদ, মাঈন উদ্দীনসহ ১০-১২ জন। ইউএনওর সরাসরি নির্দেশে ও উপস্থিতিতেই তারা সাংবাদিক মিজানের ওপর চড়াও হয় এবং তাঁকে মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় বের করে দেয়।

ঘটনার পর আহত অবস্থায় মিজান লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর তিনি আইনানুগ প্রতিকারের জন্য লোহাগাড়া থানায় লিখিত এজহার দিতে রওনা হলে পথেই আবারও তোপের মুখে পড়েন। কথিত ওই বিএনপি নেতা ও তাঁদের সহযোগীরা প্রকাশ্য সড়কে তাঁর ওপর পুনরায় হামলা চালানোর চেষ্টা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে জীবন বাঁচাতে তিনি দৌড়ে লোহাগাড়া থানার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী সাংবাদিক নিরাপত্তার স্বার্থে থানার ভেতরে অবস্থান করছেন এবং মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিক মিজান বলেন, "আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত চক্রান্ত করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি কোনোমতে দৌড়ে থানায় না ঢুকলে ওরা হয়তো আমাকে আজ মেরেই ফেলত।"

প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে সাংবাদিক ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিভিন্ন স্তরের সাংবাদিকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওঠে নিন্দার ঝড়। সাংবাদিক নেতাদের অভিমত, খবরের বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে প্রেস কাউন্সিল কিংবা প্রচলিত আইনি পথ অনুসরণের সুযোগ ছিল। তা না করে একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজ বাংলোতে ক্যাডার ডেকে এনে সংবাদকর্মীকে পেটালেন, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। তাঁরা অবিলম্বে অভিযুক্ত ইউএনও ও জড়িতদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান।

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "সারা দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা ও নির্যাতন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। দেশের কতিপয় অসৎ সরকারি কর্মকর্তা এখন রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনে নেমেছেন, যা অত্যন্ত নজিরবিহীন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চলছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্র অচিরেই তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে বড় সংকটে পড়বে।"

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে অভিযুক্ত লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ঘটনাটি জেলা প্রশাসককে অবহিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “বিষয়টি মাত্রই অবগত হলাম। এ বিষয়ে দ্রুত ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আমি এখনই জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিচ্ছি। সাংবাদিকদের সাথে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুনে আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে।”

বিষয় : লোহাগাড়া ইউএনও সাংবাদিক নির্যাতন

আপনার মতামত লিখুন

কোন মন্তব্য নেই।

মতামত দিন
Sokaler Bangladesh

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


লোহাগাড়ায় ইউএনওর বাংলোয় সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ, নিরাপত্তায় থানায় আশ্রয়

প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রকাশিত সংবাদের জের ধরে এক সংবাদকর্মীকে সরকারি বাসভবনে (বাংলো) ডেকে এনে নির্মমভাবে প্রহারের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে। নির্যাতন শেষে প্রতিকার চেয়ে থানায় যাওয়ার পথে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ওপর দ্বিতীয় দফায় চড়াও হয় স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় লোহাগাড়াসহ সমগ্র চট্টগ্রামে সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

আক্রান্ত সাংবাদিক মিজান একটি জাতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকার লোহাগাড়া উপজেলা প্রতিনিধি। তিনি অভিযোগ করেন, লোহাগাড়ার ইউএনওর অনিয়ম-দুর্নীতি এবং স্থানীয় কিছু নামধারী বিএনপি নেতার ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেই তাঁকে এভাবে চক্রান্ত করে নির্যাতন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল ফোন করে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ইউএনওর বাংলোতে যেতে বলেন। অফিসের ফোন পেয়ে মাগরিবের নামাজের পর সরল বিশ্বাসেই তিনি সেখানে যান। কিন্তু বাংলোর ভেতরে প্রবেশ করার পরই তাঁর ওপর নেমে আসে নির্যাতন।

কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তাঁর হাতের মুঠোফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ইউএনও মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলোতে আগে থেকেই অবস্থান করছিল স্থানীয় বিএনপি নেতা মোরশেদ, মাঈন উদ্দীনসহ ১০-১২ জন। ইউএনওর সরাসরি নির্দেশে ও উপস্থিতিতেই তারা সাংবাদিক মিজানের ওপর চড়াও হয় এবং তাঁকে মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় বের করে দেয়।

ঘটনার পর আহত অবস্থায় মিজান লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর তিনি আইনানুগ প্রতিকারের জন্য লোহাগাড়া থানায় লিখিত এজহার দিতে রওনা হলে পথেই আবারও তোপের মুখে পড়েন। কথিত ওই বিএনপি নেতা ও তাঁদের সহযোগীরা প্রকাশ্য সড়কে তাঁর ওপর পুনরায় হামলা চালানোর চেষ্টা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে জীবন বাঁচাতে তিনি দৌড়ে লোহাগাড়া থানার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী সাংবাদিক নিরাপত্তার স্বার্থে থানার ভেতরে অবস্থান করছেন এবং মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিক মিজান বলেন, "আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত চক্রান্ত করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি কোনোমতে দৌড়ে থানায় না ঢুকলে ওরা হয়তো আমাকে আজ মেরেই ফেলত।"

প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে সাংবাদিক ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিভিন্ন স্তরের সাংবাদিকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওঠে নিন্দার ঝড়। সাংবাদিক নেতাদের অভিমত, খবরের বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে প্রেস কাউন্সিল কিংবা প্রচলিত আইনি পথ অনুসরণের সুযোগ ছিল। তা না করে একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজ বাংলোতে ক্যাডার ডেকে এনে সংবাদকর্মীকে পেটালেন, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। তাঁরা অবিলম্বে অভিযুক্ত ইউএনও ও জড়িতদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান।

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "সারা দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা ও নির্যাতন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। দেশের কতিপয় অসৎ সরকারি কর্মকর্তা এখন রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনে নেমেছেন, যা অত্যন্ত নজিরবিহীন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চলছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্র অচিরেই তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে বড় সংকটে পড়বে।"

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে অভিযুক্ত লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ঘটনাটি জেলা প্রশাসককে অবহিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “বিষয়টি মাত্রই অবগত হলাম। এ বিষয়ে দ্রুত ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আমি এখনই জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিচ্ছি। সাংবাদিকদের সাথে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুনে আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে।”


Sokaler Bangladesh

সম্পাদক ও প্রকাশক- রবিউল ইসলাম
কপিরাইট © ২০২৬ Sokaler Bangladesh । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত