শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষার পরিবেশের অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলে শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষার সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোথাও পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই, কোথাও শৌচাগার ও শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খারাপ। দীর্ঘ স্কুলসূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি নিয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে আবারও বিক্ষোভ হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন সারা দেশে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। ওই দিনের বিক্ষোভে ৫০৪ জনকে আটক করা হয় এবং পুলিশের ৪৮ সদস্য আহত হন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আন্দোলনের মুখে সরকার তিন হাজারের বেশি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, শিক্ষকসংকটে থাকা স্কুলগুলোতে বিকল্প শিক্ষক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশের মতে, সাময়িক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষকসংকটের সমাধান প্রয়োজন।
বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিছু ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা। পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। তবে কিশোরটি কীভাবে আহত হয়েছিল, তা নিয়ে পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ঘটনার পর বিক্ষোভ দমনে স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। পুলিশি বলপ্রয়োগের সীমা এবং বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে লিল শহরের বিক্ষোভকারীদের মুখে ‘সবাই পুলিশকে ঘৃণা করে’ স্লোগানের কথা উঠে এসেছে। তবে এই বক্তব্যকে ফ্রান্সের সব মানুষের মতামত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাংশ তরুণের ক্ষোভ ও পুলিশের প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার পাশাপাশি পুলিশি আচরণ নিয়ে বিতর্ক আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হচ্ছে। কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন ল্য পেন বিক্ষোভের সময় স্কুল ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো আগামী ১৩ অক্টোবর নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। সরকার অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ ও সংস্কারের আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ চান। ফলে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা ও তরুণদের ক্ষোভ নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
ইম
বিষয় : আন্তর্জাতিক গবেষণা

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষার পরিবেশের অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলে শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষার সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোথাও পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই, কোথাও শৌচাগার ও শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খারাপ। দীর্ঘ স্কুলসূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি নিয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে আবারও বিক্ষোভ হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন সারা দেশে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। ওই দিনের বিক্ষোভে ৫০৪ জনকে আটক করা হয় এবং পুলিশের ৪৮ সদস্য আহত হন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আন্দোলনের মুখে সরকার তিন হাজারের বেশি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, শিক্ষকসংকটে থাকা স্কুলগুলোতে বিকল্প শিক্ষক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশের মতে, সাময়িক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষকসংকটের সমাধান প্রয়োজন।
বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিছু ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা। পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। তবে কিশোরটি কীভাবে আহত হয়েছিল, তা নিয়ে পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ঘটনার পর বিক্ষোভ দমনে স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। পুলিশি বলপ্রয়োগের সীমা এবং বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে লিল শহরের বিক্ষোভকারীদের মুখে ‘সবাই পুলিশকে ঘৃণা করে’ স্লোগানের কথা উঠে এসেছে। তবে এই বক্তব্যকে ফ্রান্সের সব মানুষের মতামত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাংশ তরুণের ক্ষোভ ও পুলিশের প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার পাশাপাশি পুলিশি আচরণ নিয়ে বিতর্ক আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হচ্ছে। কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন ল্য পেন বিক্ষোভের সময় স্কুল ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো আগামী ১৩ অক্টোবর নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। সরকার অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ ও সংস্কারের আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ চান। ফলে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা ও তরুণদের ক্ষোভ নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
ইম

কোন মন্তব্য নেই।