বয়স মাত্র ১০-১১ বছর। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই সংসারের হাল ধরেছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুরনবী। বাবাকে হারিয়ে অভাবের সংসারে মায়ের পাশে দাঁড়াতে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সিরাজকান্দী বাজারে ডিম বিক্রি করত সে। তবে এবার তার পরিবারে আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে মানবতার সেবায় সোহেল ও হাবিবা ফাউন্ডেশন।অসহায় নুরনবী উপজেলার সিরাজকান্দী এলাকার আব্দুর রহিম ও নুরজাহান দম্পতির ৪ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান।বুধবার (১৪ অক্টোবর) সরেজমিনে নুরনবীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সেই আসমানীর মতো জীর্ণ ঘরে ৪ সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নুরনবীর মা নুরজাহান বেগম।জানা যায়, নুরনবী উপজেলার সারপলিশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা আব্দুল রহিম মিঞা ছিলেন একজন প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। এরপর চার ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়েন মা নুরজাহান বেগম। গৃহিণী এই মায়ের পক্ষে সংসারের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের বড় ছেলে নুর আলম মাদরাসায় পড়ে, নুরনবী চতুর্থ শ্রেণিতে, ছোট ভাই নিরব প্রথম শ্রেণিতে এবং সর্বকনিষ্ঠ ভাইটি এখনো কথা বলতে শেখেনি।এমন পরিস্থিতিতে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের সহযোগিতায় সিরাজকান্দী বাজারে ডিম বিক্রি করত ছোট্ট নুরনবী। তার এই করুণ চিত্র চোখে পড়ে মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত সোহেল ক্ষ্যাপার। তিনি তাঁর ‘মানবতার সেবায় সোহেল’ ফেসবুক পেজে নুরনবীর পরিবারের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য নজরে আসে হাবিবা ফাউন্ডেশনের।পরে মানবতার সেবায় সোহেল ও হাবিবা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে নুরনবীর মায়ের হাতে একটি মনিহারি দোকান উপহার দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পরিবারটির নিয়মিত আয়ের একটি পথ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি নুরনবী ও তার ভাইদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।দোকান পেয়ে নুরনবীর মা নুরজাহান বেগম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, নুরনবীর বাবা মারা যাবার পর নুরনবী ছোট্ট কাঁধে সংসারের দ্বায়িত্ব তুলে নেন। ডিম বিক্রি করে দৈনিক ১০০ টাকা আয় দিয়ে কোনমতে খেয়ে না খেয়ে দিনপার করতাম। সোহেল ভাই ও হাবিবা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আমাদের যে সহযোগিতা করেছেন সেটা সারাজীবন মনে থাকবে। আমার সন্তানদের পড়াশোনা আর সংসার চালাতে নুরনবীকে আর ডিম বিক্রি করতে হবে না। স্থানীয়রা জানান, নুরনবীর বাবা মারা যাওয়ার পর খেয়ে না খেয়ে দিন পার করে আসছে পরিবারটি। হাবিবা ফাউন্ডেশন ও সোহেল ক্ষ্যাপার এমন মহতী উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় কাজ। সমাজের বিত্তবানরা যদি এভাবে অসহায়দের পাশে দাঁড়ান, তবে সুন্দর একটি সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।স্বেচ্ছাসেবী সোহেল ক্ষ্যাপা বলেন, নুরনবীর দুরবস্থা আমাকে চরমভাবে ব্যথিত করে। সব সময় আমি মানবকল্যাণে কাজ করতে চাই। সেই থেকেই নুরনবীর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। এ কাজে আমাকে আর্থিক ও মানসিকভাবে সহযোগিতা করেছে হাবিবা ফাউন্ডেশন।একটি দোকান শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, অসহায় এই পরিবারটির কাছে এটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশাও। সহায়তাটুকু কাজে লাগিয়ে নুরনবী যেন আর সংসারের চিন্তায় শৈশব হারিয়ে না ফেলে, বরং পড়াশোনা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে- এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।